রোজ, শনিবার ৯ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

খুলনার চুকনগরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে হাইকোর্টের আদেশ, আপীলে যাচ্ছে জেলা পরিষদ

খুলনার চুকনগরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে হাইকোর্টের আদেশ, আপীলে যাচ্ছে জেলা পরিষদ

শেখ মাহতাব হোসেন ডুমুরিয়া খুলনা।
৭০টি দোকান বরাদ্দ দিয়ে ৭ কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ
খুলনা (০৯ ডিসেম্বর) খুলনার চুকনগর বাজারের যতিন-কাশিম সড়কে খুলনা জেলা পরিষদ কর্তৃক স্থাপিত অবৈধ স্থাপনা আগামী তিন মাসের মধ্যে উচ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত। স্থানীয়দের রিটের ভিত্তিতে গত ৬ নভেম্বর এই নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে এ নির্দেশনা গত এক মাসেও বাস্তবায়িত হয়নি। জেলা পরিষদ বলছে তারা এই রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর বাজারের যতিন-কাশিম সড়ক ৭০ ফুট প্রশস্ত। তবে সেটি কাগজে-কলমেই। যাতায়াতের জন্য এখন রয়েছে মাত্র ৩২ ফুট। বাকি ৩৮ ফুটে নির্মিত হয়েছে আধাপাকা দোকান ঘর। বাজার এলাকায় সড়কের দুপাশে গড়ে তোলা হয়েছে ৭০টি দোকানঘর।

অভিযোগ রয়েছে, দোকানপ্রতি ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে সড়কের জায়গা ইজারা দিয়েছে খুলনা জেলা পরিষদ। আর এভাবে ৭ কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নিয়েছে পরিষদের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী। জেলা পরিষদে জমা পড়েছে যৎসামান্য জমি ইজারার মূল্য, আয়কর ও ভ্যাটের টাকা।
নথি ঘেঁটে জানা যায়, ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর থেকে যশোরের নওয়াপাড়া যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত (যতিন-কাশিম সড়ক) সড়কের দুপাশের রেকর্ডীয় জমির মালিকরা দীর্ঘদিন ইজারা নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন। ২০২১ সালে যানজট কমাতে সড়কটি সম্প্রসারণের কথা বলে সব স্থাপনা উচ্ছেদ করে জেলা পরিষদ।
তবে উচ্ছেদের পর সড়কটি সম্প্রসারণ না করে ২০২২ সালে ওই জমি পুনরায় ইজারা দিতে দোকানঘর নির্মাণ শুরু করে সংস্থাটি। তখন ব্যবসায়ীরা দোকান নির্মাণে বাধা দেন। কিন্তু নির্মাণকাজ বন্ধ না করে উল্টো তাদের হয়রানি করা হয়। পরে স্থানীয় ব্যবসায়ী পার্থ কুমার কুন্ডু প্রতিকার পেতে ও সড়কের দুপাশে দোকানঘর বন্ধে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
তার অভিযোগ পেয়ে কমিশন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের জেলা পরিষদ শাখাকে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের চিঠি দেয়। স্থানীয় সরকার বিভাগ দোকানঘর বন্ধের বিষয়ে সরেজমিন তদন্ত প্রতিবেদন প্রদানে ২০২৩ সালের ১৭ এপ্রিল খুলনা স্থানীয় সরকারকে চিঠি দেয়। এরপর খুলনা স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক মো. ইউসুফ আলী তদন্ত শেষে ওই বছর ১৭ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগে প্রতিবেদন দাখিল করে।
ডুমুরিয়া সহকারী কমিশনারের (ভূমি) বরাত দিয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, খুলনা, যশোর ও সাতক্ষীরা জেলার সংযোগস্থল চুকনগর বাজার। এ বাজারের প্রবেশ সড়ক যতিন-কাশিম সড়ক। আগে খুলনা-সাতক্ষীরা যাওয়ার ক্ষেত্রে সড়কটি ব্যবহার হতো। সড়কটি ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর মৌজায় সিএস ৮৫১ নম্বর ও এসএ ২ নম্বর উভয় খতিয়ানে ১২৭ দাগে অবস্থিত। সিএস খতিয়ানে ওই জমি ‘জনসাধারণের ব্যবহার্য রাস্তা’, এসএ খতিয়ানে ‘রাস্তা’ নামে উল্লেখ রয়েছে। এসএ ১২৭ দাগের প্রস্থ ৭০ ফুট। যার মধ্যে এখন সড়ক হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে ৩২ ফুট। সড়কের দুপাশে ১৮ ও ২০ ফুট মোট ৩৮ ফুট জায়গায় টিনের ছাউনির পাকাঘর নির্মিত হয়েছে। সড়কের দুপাশে লম্বা সারি সারি গড়ে তোলা হয়েছে দোকানঘর।
সরেজমিন পরিদর্শন ও স্থানীয়দের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সড়কের দুপাশে অবৈধ প্রতিষ্ঠান ও ঘরবাড়ি গড়ে ওঠে। জনস্বার্থে সড়কটি সম্প্রসারণে জেলা প্রশাসককে ২০২০ সালে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে চিঠি দেয় জেলা পরিষদ। যার পরিপ্রেক্ষিতে ২০২১ সালে অবৈধ অবকাঠামো উচ্ছেদ করা হয়। কিন্তু উচ্ছেদের পর সড়কটি সম্প্রসারণে কোনো কার্যক্রমই গ্রহণ করেনি জেলা পরিষদ। বরং সেই জমিতে ৭০টি টিনের ছাউনির পাকা দোকানঘর নির্মাণ করে পুনরায় ইজারা প্রদান করেছে সংস্থাটি।
অথচ জেলা পরিষদ সম্পত্তি (অর্জন, ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ ও হস্তান্তর) বিধিমালা, ২০১৭-এর ১০ নম্বর অনুচ্ছেদের (২) উপ-বিধি (১)-এ বলা হয়েছে, যাহা কিছুই থাকুক না কেন, পরিষদের নিয়ন্ত্রণভুক্ত বা এখতিয়ারাধীন জনপদ বা সর্বসাধারণের ব্যবহার্য সম্পত্তি হস্তান্তর করা যাবে না।
তদন্ত প্রতিবেদনের মতামতে বলা হয়, প্রাপ্ত তথ্য ও ডকুমেন্ট অনুযায়ী কোনো ধরনের জনস্বার্থ রক্ষার্থে ওই জমিতে দোকানঘর নির্মাণপূর্বক জেলা পরিষদ পুনরায় প্রদান করেছে তা স্পষ্ট নয় মর্মে প্রতীয়মান হয়।
এদিকে, চুকনগর বাজারের যতিন-কাশিম সড়কের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও সড়কটি মানুষসহ যানবাহন চলাচলের উপযোগী করার জন্য চুকনগর বাজারের ব্যবসায়ী পার্থ কুমার কুন্ডুসহ ২৬ জন ব্যবসায়ী ২০২১ সালের ১৩ জুন উচ্চ আদালতে (হাইকোর্ট) রিট করেন। সেই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৬ নভেম্বর সড়কের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও ভারী এবং উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পরিবহনসহ সকল যানবাহনের জন্য বাধাহীন যাতায়াত নিশ্চিত করার জন্য আদালত নির্দেশ দেন।
আদালতের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এই রায় এবং আদেশ প্রাপ্তির তারিখ থেকে আগামী তিন মাসের মধ্যে উক্ত সড়কের অননুমোদিত নির্মাণ- যার মধ্যে ভবন, দোকান, অস্থায়ী কাঠামো এবং যেকোনো নির্মাণ সামগ্রী অপসারণ করে পুনরায় সম্পূর্ণ মূল প্রস্থ এবং প্রান্তিককরণে পুনরুদ্ধার করতে হবে; যাতে ভারী এবং উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পরিবহন সহ সকল যানবাহনের জন্য বাধাহীন যাতায়াত নিশ্চিত করা যায়। এছাড়া জেলা পরিষদ এবং স্থানীয় প্রশাসন জোতিন কাশেম মহাসড়কের রাস্তার ধারের জমিতে কোনও ইজারা, অনুমতি, অনুমোদন, অথবা কোনো দখল প্রদান থেকে বিরত এবং নিষিদ্ধ করা হচ্ছে।
উক্ত রায়ে ব্যবসায়ী মোস্তফা কামালসহ স্থানীয় স্বস্তি প্রদান করে বলেন, চুকনগর বাজারের যতিন-কাশিম সড়কের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হলে ভারীসহ সকল যানবাহন নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারবে। এছাড়া যানবাহন চলাচল করতে পারলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও উপকৃত হবে। তবে আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নে এক মাসেওর অধিক সময় পার হলেও কোন অগ্রগতি না হওয়ায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
জানতে চাইলে খুলনা জেলা পরিষদের প্রশাসক ও খুলনা বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) হুসাইস শওকাত বলেন, চুকনগর বাজারের যতিন-কাশিম সড়কের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে রিটের ভিত্তিতে উচ্চ আদালত থেকে একটি রায় হয়েছে। আমরা জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করব। যদি আপিলের পরও যদি রায় বহলা থাকে তাহলে চুকনগর বাজারের যতিন-কাশিম সড়কের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে।